Feeds RSS

Thursday, April 1, 2010

খনা কাহিনী - ৫

‘খনা’ ছদ্মনামের এক বিদুষী নারী যার অন্য নাম লীলাবতী। তার জীবনের গল্পটা বেশ পুরোনো, বন্দি তিনি কিংবদন্তীর মায়া দেয়ালে। সেই দেয়াল টপকে তবু তাকে যতোটা বুঝতে পারা যায় তাতে বোধ হয় তিনি এক বিদুষী জ্যোতিষী। খনার স্বামী মিহিরও একই বৃত্তিধারী। শ্বশুর যশস্বী বরাহ মিহির। পুত্রজায়ার যশ, খ্যাতি ও বিদ্যার প্রভাব দর্শনে প্রকাশ পায় বরাহের হীনম্মন্যতা ও ঈর্ষা। শ্বশুরের নির্দেশে লীলাবতীর জিহ্বা কর্তন ও তার ‘খনা’ হয়ে ওঠার গল্প পেরিয়েছে প্রজন্মের সীমানা।
চন্দ্রকেতু গড়, যেখানে আজো আছে খনা মিহিরের স্মৃতিচিহ্ন। বরাহ মিহির বানহন্ডার দেউলনগর বা দেউলানগরের রাজা ধর্মকেতুর রাজজ্যোতিষী। পুত্র মিহিরের জন্মকোষ্ঠী ভুল গণনা করে তাকে একেবারে ভাসিয়েছিলেন বিদ্যাধরীর জলে। সেই হতভাগা মিহিরকে নিয়ে খনা হাজির ইন শ্বশুর বরাহের সামনে, চরমভাবে বুল প্রমান করেন বরাহের গণনা। সেই সুবাদে ধর্মকেতুর রাজসভা পরিচিত এবং প্রশংসিত হন মিহির ও লীলাবতী। দু’জনেই রাজ সভাসদ পদও লাভ করেন। পুত্রবধূর এমন ঝলমলে উত্থান মেনে নিতে পারেন না বরাহ। অন্যদিকে খনা মুক্ত প্রাণের টানে বাধনহারা হয়ে মিশে চলেন নতুন দেশের নতুন মানুষদের সাথে। প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় শাসককুলের সামনে। লেখ্য ভাষ্যহীন প্রাকৃতদের কৃষি সংক্রান্ত জ্ঞানের রাজ্যকে বিকাশে গেঁথে চলেন বচনের পর বচন, যা কৃষকের মুখে আজো টিকে আছে তার শাশ্বত প্রাণ নিয়ে। বরাহ চেষ্টা করেন লীলাবতীকে বশে আনার। কিন্তু লীলা চলছেন নিজের ইচ্ছেমতো। লীলার অবাধ্যতায় ক্রুব্ধ বরাহ পুত্রকে আদেশ করেন লীলার জিহ্বা কর্তন করে তাকে যেন উৎসর্গ করা হয়। খনার বচনের মাঝে টিক থাকা শত বছরের জল, মাটি, ফসল আর শ্রমমুখর মানুষের গন্ধ মাখা জ্ঞান আর সত্যটুকু কি সত্যি লীলাবতীর নাকি এ সত্য তথ্য সবই এ ভূখণ্ডের বৃষ্টি, পলি, আলো আর জল হাওয়ার সাথে মিশে থাকা যুগান্তরের সামষ্টিক জ্ঞানের সংকলন? এমন বর্বরোচিত নির্মম পরিণতি লীলাবতীর একি শুধুই একজন বলেই, নাকি নারী হয়েই তিনি চাষাভুষোর সাথে মিশেছেন বলে, সেই তার কাল? পুরুষতন্ত্র না শ্রেণী কাঠমো; নাকি উভয় দাঁড়ানো লীলাবতীর বিপ্রতীপে? স্বামী মিহির বা প্রাকৃত লোকালয় কারো পরোয়া না করে। সকল পিছুটানের মায়া শেকল ভেঙে নিজেকে খনা নিয়ে যান দিগন্তের ওপারে। শুধু স্বাক্ষী হয়ে থেকে যায় পথে প্রান্তরে কৃষকের মুখে মুখে খনার শান্ত সঙ্গগুলো। তবু প্রশ্ন দানা বাঁধে মনে খনার সত্যিই কি একক সত্য, নাকি আজকে যা নির্ভুল কাল তাই হতে পারে অসত্য? কেবলই সত্যের পথে দাঁড়ানোর যে মৃত্যুনেশা তার সে নেশা কি একরোখা জেদ? এভাবে খনা নিজেকে নিজেই করেছেন প্রশ্নের সম্মুখীন।

Wednesday, January 20, 2010

খনা কাহিনী - ৪

লিখেছেন রণদীপম বসু

০১.
‘মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা’ কিংবা ‘কলা রুয়ে না কাটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত’ অথবা ‘বেঙ ডাকে ঘন ঘন, শীঘ্র হবে বৃষ্টি জান’ বা ‘বামুন বাদল বান, দক্ষিণা পেলেই যান’, এগুলো জনপ্রিয় খনার বচন। কৃষিভিত্তিক জন-মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত এরকম বহু লোক-বচনের সাথেই আমরা পরিচিত। খনার বচনও আছে প্রচুর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের লোক-সাহিত্যে খনা নামে কেউ কি আদৌ ছিলেন ? আসলে এ প্রশ্নটাও বিভ্রান্তিমূলক। কেননা লোক-সাহিত্য বলতেই আমরা বুঝে নেই যে, লোক-মুখে প্রচলিত সাহিত্য অর্থাৎ জনরুচির সাথে মিশে যাওয়া যে প্রাচীন সাহিত্য বা সাহিত্য-বিশেষের কোন সুনির্দিষ্ট রচয়িতার সন্ধান আমরা পাই না বা জানা নেই তা-ই লোক-সাহিত্য। সাহিত্যে যেহেতু রয়েছে, রচয়িতা আছে তো বটেই। কিন্তু তা লিপিবদ্ধ ছিলো না বলে কাল-চক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া এই রচয়িতারা নাম-পরিচয় হারিয়ে চিহ্ণহীন লোকায়ত পরিচয়ে চিরায়ত জনস্রোতের অংশ হয়ে গেছেন। তাঁদের লিপিহীন মহার্ঘ রচনাগুলো হয়ে গেছে আমাদের সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, অনেক গবেষক-সংগ্রাহকদের গভীর শ্রমসাধ্য অবদানে কালে কালে সংগৃহীত ও সংরক্ষিত হয়ে যাকে আমরা আজ লোক-সাহিত্য বলে চিহ্ণিত করছি।
লোক-সাহিত্যের এই প্রাথমিক ও অনিবার্য বৈশিষ্ট্য স্বীকার করে নিলে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবে এ সিদ্ধান্তে আসতে হয় যে, খনার বচন বিশুদ্ধ লোক-সাহিত্যের অংশ হতে পারে কি না, নয়তো লোক-সাহিত্যে খনা নামের সুনির্দিষ্ট কোন একক রচয়িতা থাকতে পারে কি না। এক্ষেত্রে যেকোন একটি সম্ভাবনা সত্য হওয়া সম্ভব। পরস্পর-বিরোধী দুটো সম্ভাবনা একইসাথে সত্য হতে পারে না। তাহলে কোনটি সত্য ?
‘খনা’ নামে কেউ থাক বা না থাক, খনা (khona) নাম বা শব্দটি যে আজ কিংবদন্তী, তা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবেন না। গ্রামে গঞ্জে কৃষি-সম্পৃক্ত আমাদের প্রাচীন প্রবীন গুরুজনেরা এখনো খনা’র কৃষিতত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন কালজয়ী বচনের মাধ্যমে অন্যদেরকে জ্ঞানদান করে থাকেন। জলবায়ু ও প্রকৃতির সাথে কৃষির নিবিড় সম্পর্ক অনস্বীকার্য। এই সম্পর্কগুলো খনার বচনের মধ্য দিয়ে যে অব্যর্থ সূত্রাবদ্ধতা পেয়ে গেছে, তাকে কালোত্তীর্ণের মর্যাদা না দিয়ে উপায় নেই। কিন্তু তাতে করে খনা নামের কোন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিপরিচয় প্রমাণসিদ্ধ হয় না। বর্তমানে সংগৃহীত খনার এই আদি বচনগুলোর এরূপ কোন প্রমাণসিদ্ধ লিপিবদ্ধতা না থাকায় জনভাষ্যের কালপরিক্রমায় সেগুলোর অঞ্চল ও ভাষাভিত্তিক বহু ভ্রংশ-উপভ্রংশ ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে এগুলোর আদিরূপ জানার কোন উপায় আর অবশিষ্ট নেই। এছাড়া জনমানুষের মুখে মুখে জনশ্রুত বচনগুলোয় যে কোনো একজন খনার গুটিকয় বচনের সাথে কালে কালে আরো বহু খনার প্রাকৃতিক রচনার সম্মিলন ঘটে নি, তা-ই বা কে বলবে ? বরং কালে কালে কৃষিভিত্তিক সমাজ-সংশ্লিষ্ট বহু জনের বহু অভিজ্ঞতার সমন্বয় সাধনের মধ্য দিয়ে একটা সম্মিলিত মাত্রা পাওয়া এই শ্লোকসদৃশ জমাট রূপটিকেই অধিক যুক্তিসংগত বলে মনে হয়। তাই খনার বচন বলতে আমরা যদি খনা নামের কোন একক ব্যক্তিবিশেষের রচনা না বলে বিভিন্ন কালের বিভিন্ন জনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাপ্রসূত জ্ঞানের জমাটবদ্ধ সম্মিলিত রচনা বলে বিবেচনা করি, তা কি খুব অযৌক্তিক হবে ?
০২.
জনভাষ্যের রহস্যময় প্রতিনিধিত্বকারী এই প্রতীকী চরিত্র খনা আসলে কি কোন মিথ-আশ্রয়ী চরিত্র ? ঢাকা ‘নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা’ প্রকাশনী থেকে ২৩ মে ১৯৯৫, ০৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪০২-এ একশ’টি বচনের সমন্বয়ে ‘খনার বচন’ নামে প্রকাশিত হাতের মুঠোয় পুরে ফেলার মতো ক্ষুদ্রাকৃতির বইটির ‘বিদূষী খনা’ শিরোনামে গ্রন্থিত ভূমিকাতূল্য লেখাটিতে কিছু মজার বিষয় লক্ষ্য করা যায়। ‘খনা যে প্রাচীন বাংলাদেশের একজন বিদূষী খ্যাতনাম্নী জ্যোতিষী ছিলেন, সে সম্পর্কে সন্দেহের আর কোন অবকাশ নেই’ বলে সন্দেহমুক্ত করতে নিশ্চয়তাবিধানের যে প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে, তাতে কি আমরা আসলে সন্দেহমুক্ত হতে পারি ? ওখানে আবার বলা হচ্ছে- ‘খনা সম্পর্কে বাংলা ও উড়িয়া ভাষায় কিংবদন্তী আছে। গল্প দুটি প্রায় একরকম কিন্তু একটি মূল জায়গায় মত-পার্থক্য আছে।’ কী সেই মত-পার্থক্য ? তা বুঝতে আমাদেরকে উপরোক্ত বই অনুসরণে কিংবদন্তীয় গল্পটি সম্পর্কে আগে একটা ধারণা নিতে হয়।

কিংবদন্তী:
‘খনা ছিলেন লংকাদ্বীপের রাজকুমারী। লংকাদ্বীপবাসী রাক্ষসগণ একদিন স্ববংশে তাঁর পিতা-মাতাকে হত্যা করে এবং তাঁকে হস্তগত করে। একই সময়ে উজ্জয়িনীর মহারাজ বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার প্রখ্যাত জ্যোতিষ পণ্ডিত বরাহ তাঁর ভুল গণনায় স্বীয় নবজাত শিশু সন্তান মিহির-এর সহসা অকাল মৃত্যুর কথা জেনে নবজাতককে একটি তাম্র-পাত্রে রেখে স্রোতে ভাসিয়ে দেন। জ্যোতিষ গণনায় তিনি মনে করেছিলেন এভাবে শিশুটি মৃত্যু থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে। পরিত্যক্ত এই শিশুকেও ভাসমান তাম্র-পাত্র থেকে রাক্ষসেরা তুলে নেয় এবং দুটো শিশুকে একসাথে পালন করতে থাকে।

খনা ও মিহির কালক্রমে জ্যোতিষ শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন এবং যৌবনে পরস্পর পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। খনা খগোল শাস্ত্রেও পারদর্শী হয়ে ওঠেন। একদিন খনা ও মিহির গণনায় অবগত হলেন যে, মিহির উজ্জয়নীর সভাপণ্ডিত বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহের পুত্র। এক মাহেন্দ্রক্ষণে উভয়ে রাক্ষস গুরুর অনুমতিক্রমে এবং একজন অনুচরের সহায়তায় পালিয়ে ভারতবর্ষে যাত্রা করেন। উজ্জয়িনীতে এসে খনা ও মিহির পণ্ডিত বরাহের নিকট আত্মপরিচয় দেন। কিন্তু পণ্ডিত সে কথা বিশ্বাস করতে চাইলেন না। কারণ তিনি গণনা দ্বারা জানতে পেরেছিলেন যে, এক বছর বয়সেই তাঁর পুত্র মিহিরের মৃত্যু ঘটবে। খনা তখন তাঁর একটি বচন উদ্ধৃতি দিয়ে শ্বশুরের ভুল গণনা প্রতিপন্ন করেন-

‘কিসের তিথি কিসের বার, জন্ম নক্ষত্র কর সার
কি করো শ্বশুর মতিহীন, পলকে আয়ু বারো দিন।’

অর্থাৎ এ গণনায় মিহিরের আয়ু ১০০ বছর। পণ্ডিত বরাহ সানন্দে খনা ও মিহিরকে স্বগৃহে গ্রহণ করেন। এদিকে পালাবার পর দ্বীপনেতা পলাতক দম্পতিকে ধরার জন্যে আয়োজন করেছিলেন। তখন খনা-মিহিরের ওস্তাদ বলেন যে, ওরা জ্যোতিষী গণনা দ্বারা এমন এক অনুকূল মুহূর্তে পলায়ন করেছেন যে, তারা নিরাপদে পৌঁছে যাবেন। ফলে অনুসন্ধান পরিত্যক্ত হয়।

ক্রমে খনার অগাধ জ্ঞানের কথা জানাজানি হয়ে যায়। রাজসভাতে তিনি আমন্ত্রিত হন। খনার জ্ঞান-গরিমা সভা-পণ্ডিতদের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি তিনি পণ্ডিত বরাহের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বহু দুঃসাধ্য সমস্যা সমাধান করে দিতে লাগলেন। এতে অপমানিত ও ঈর্ষান্বিত পণ্ডিত বরাহ পুত্র-বধুকে জিহ্বা কর্তন করে তাকে বোবা বানিয়ে দেয়ার জন্য পুত্রকে আদেশ করেন। মিহির খনাকে একথা সবিশেষ জানান। খনা এ শাস্তি মেনে নেন। পিতৃ-আদেশে মিহির এক তীক্ষ্ণধার ছুরিকা দ্বারা খনার জিহ্বা কর্তন করেন। মাত্রাধিক রক্তক্ষরণে অসামান্যা বিদূষী খনার মৃত্যু হয়। খনার কর্তিত জিহ্বা ভক্ষণ করে টিকটিকি গুপ্ত জ্ঞান লাভ করে।

উড়িয়া কিংবদন্তী অনুযায়ী খনার আসল নাম ছিল লীলাবতী। শ্বশুর বরাহ তার পুত্র মিহিরকে আদেশ করেছিলেন পুত্রবধুর জিহ্বা কেটে ফেলতে। তাই সে ‘খনা’। আসলে লীলাবতী ও খনা একই ব্যক্তি হতে পারেন। তবে দুটো গল্পেরই সারমর্ম এক: খনার মৃত্যুর কারণ ছিল তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা।

উড়িয়া কিংবদন্তী অনুযায়ী পিতার আদেশ পেয়ে নিরূপায় স্বামী মিহির খনার জিহ্বা কর্তনের পূর্বে কিছু কথা বলার সুযোগ দিয়েছিলেন। খনা তখন কৃষি, আবহ-তত্ত্ব, জ্যোতিষশাস্ত্রীয় এবং মানবজীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বহুবিধ কথা বলে যান। পরবর্তীকালে সে সব কথা ‘বোবার বচন’ বা খনার বচন’ নামে অভিহিত হয়।

খনা সিংহলের রাজকুমারী হলেও বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক-সূত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন ইতিহাসে। ফলে খনার ভাষা বাংলা হওয়া খুব অবাস্তব নয়। তবে খনার বচনের বর্তমান ভাষা মূল ভাষার বিবর্তিত রূপ। তাঁর আবির্ভাব কাল সম্পর্কে ধারণা করা যায় সম্ভবত তিন চারশ’ বর্ষের মধ্যে হয়েছিল।’

‘খনার বচন’ পুস্তিকার উপরোক্ত রূপকথা জাতীয় গল্প ও একপেশে অনুসিদ্ধান্তটি পড়ে খনা নামের সুনির্দিষ্ট কারো অস্তিত্বের স্বপক্ষে স্পষ্ট ও যৌক্তিক কোন সিদ্ধান্তে আসা কি সম্ভব ?

খনা বিষয়ক অন্য এক কিংবদন্তী অনুসারে তাঁর নিবাস ছিলো পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার বারাসাতের দেউলি গ্রামে। পিতার নাম অনাচার্য। চন্দ্রকেতু রাজার আশ্রম চন্দ্রপুরে তিনি বহুকাল বসবাস করেন। কিন্তু কিংবদন্তী তো কিংবদন্তীই, মানব-কল্পনার পাখা যেখানে অবাধ্য মাধুরী নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ইচ্ছাপুরে !

০৩.
বাংলা লোকসাহিত্যের চারটি মৌলিক উপাদান- প্রবাদ ও প্রবচন, ধাঁধা, ছড়া ও মন্ত্র নিয়ে গবেষক অধ্যাপক ওয়াকিল আহমদ-এর অত্যন্ত পরিশ্রমের ফসল বইপত্র প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত ৭৬৮ পৃষ্ঠার ঢাউস আকারের গবেষণা গ্রন্থ ‘বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা’। এটা মূলত তাঁর সংশ্লিষ্ট চারটি গবেষণা গ্রন্থ, যার প্রথম তিনটি প্রথমে বাংলা একাডেমী ও চতুর্থটি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত, এর সামষ্টিক প্রকাশনা বলা যায়। এর প্রথম অংশটির নাম ‘প্রবাদ ও প্রবচন’। এই অংশের ভূমিকায় লেখকের উদ্ধৃতাংশ প্রণিধানযোগ্য।

‘…বাংলাদেশ লোকসাহিত্য অতি সমৃদ্ধ। বাংলার মাটি খুব উর্বর; আবহাওয়া কৃষি-উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। জীবিকার জন্য বাংলার মানুষকে অধিক শ্রম করতে হয় না। এদেশে কৃষি-নির্ভর অর্থনীতি ও সামন্ত-শাসন দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়। ইংরেজ-শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এদেশে প্রকৃত অর্থে নগর গড়ে ওঠেনি। মানুষ গ্রামে-গঞ্জে বসবাস করতো। একটি সীমিত শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষা সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে লোকসাহিত্য সৃষ্টির যেসব শর্ত আবশ্যক, বাংলাদেশে সেসব বিদ্যমান ছিল। বাংলার মানুষের ভাষা ছিল, ভাষা প্রকাশের আবেগ, অনুভূতি ছিল। অক্ষর-জ্ঞান না থাকায় মানুষ নিজের সৃষ্টিকে লিপিবদ্ধ করতে পারেনি; মুখের কথা লোকমুখে তুলে দিয়েছে। শ্রুতির আর স্মৃতির উপর নির্ভর করে লোকরচনা এক পুরুষ থেকে অন্য পুরুষে প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে। লোকসাহিত্য এই অর্থেই জনসমষ্টির রচনা। মধ্যযুগের সামন্ত ও ইংরেজ আমলের আধা-সামন্ত সমাজ লোকসাহিত্য সৃষ্টির উপযোগী ক্ষেত্র ছিল বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে এ-সৃষ্টির প্রক্রিয়া আজও অব্যাহত আছে।…’

উদ্ধৃতিটি একারণেই প্রণিধানযোগ্য যে, এখান থেকেই খুব সংক্ষেপে আমাদের লোকসাহিত্যের মেজাজ, মর্জি ও সৃষ্টি-রহস্যের একটা ধারণা পেয়ে যাই আমরা। আমাদের লোকায়ত ধারায় ও সার্বজনীন রুচিতে অত্যন্ত সাবলীলভাবে মিশে থাকা বাংলা প্রবাদ ও প্রবচনের খুব শক্তিশালী সুস্পষ্ট প্রভাবটিকে আমরা কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। নিত্যদিনের কর্মকোলাহলে তা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ শুরু করলাম কিনা। আসলে তা নয়। এটা ‘পরের ধনে একটু পোদ্দারি’ করে নেয়া আর কি ! তাছাড়া পোদ্দারিটা পরের ধনেই করতে হয়। নইলে নিজের ধনে অন্য কিছু হলে হতে পারে, কিন্তু পোদ্দারি হয় না। কিভাবে ?

এই যে কথাগুলো বললাম, পাঠক হযতো খেয়াল করেছেন, তা বলতে গিয়ে দুটো বিশেষ বাক্যবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে- ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ ও ‘পরের ধনে পোদ্দারি’। এই ছোট্ট দুটো বাক্যবন্ধের বিকল্প হিসেবে যে দীর্ঘ বর্ণনা বা বিবৃতির প্রয়োজন হতো, তাতে করেও বক্তব্য-বিষয়কে কতোটা স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল করা যেতো তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু আবহমান বাঙালির প্রচলিত কিছু প্রবাদ বা প্রবচনের যথার্থ আশ্রয় ও ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সে সীমাবদ্ধতাটুকু নিমেষেই অতিক্রম করা সহজ হয়ে গেছে। দু-চারটা শব্দের এরকম একেকটা বাক্যবন্ধ হাজারটা শব্দের গাথুনির চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী। এগুলোই প্রবাদ ও প্রবচন। এর শক্তিমত্তা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকেনি বলেই আমাদের আবহমান জীবনধারায় তা লোকমুখে যুগের পর যুগ পেরিয়ে বর্তমানে এসেও এর উপযোগিতা একটুও না হারিয়ে পূর্ণ ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে সতত বহমান রয়েছে। মনের ভাব যথার্থরূপে প্রকাশে মুখের ভাষাকে দিয়েছে সমৃদ্ধি। তবে কথায় কথায় প্রবাদ ও প্রবচনের উল্লেখ টানলেও এ দুটোর মধ্যে যে বিস্তর প্রভেদ রয়ে গেছে, তা হয়তো বেশিরভাগ সময়ই আমরা খেয়াল করি না বা পার্থক্য নির্ণয়ের প্রয়োজনও বোধ করি না। উপরোক্ত যে দুটো বাক্যবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে, তার প্রথমটি ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ হচ্ছে প্রবাদ এবং দ্বিতীয়টি অর্থাৎ ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ হচ্ছে প্রবচন।

কেন একটি প্রবাদ আর অন্যটি প্রবচন, এই কৌতুহল নিবৃত্তির প্রয়োজনে আমরা আপাতত গবেষক ওয়াকিল আহমদ-এর পূর্বোক্ত ‘বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা’ গবেষণা গ্রন্থের প্রয়োজনীয় সহায়তাটুকু নিতে পারি। ‘প্রবাদ ও প্রবচন’ অংশের বিস্তৃত পরিধির মধ্যে তিনি ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রবাদ ও প্রবচনের শত শত সংগৃহিত নমুনা সংকলন করে এগুলোর আবশ্যকীয় ব্যাখ্যা, বিবেচনা, রূপ ও গঠন-প্রকৃতি নির্ণয় এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে ব্যাপক প্রস্তুতি ও প্রয়াস নিয়েছেন। আমরা নাহয় এর নির্যাসটুকুর দিকেই লক্ষ্য নিবদ্ধ করি।

প্রবাদ নিয়ে ব্যাপক মন্থনের পর তিনি প্রবাদের কতকগুলো বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করেন এভাবে-

০১. প্রবাদ হলো একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বাক্য।
০২. প্রবাদের উদ্ভবে লোকের বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে।
০৩. বাচ্যার্থ নয়, ব্যঞ্জনার্থই প্রবাদের অর্থ। এই অর্থে প্রবাদ রূপকধর্মী রচনা।
০৪. প্রবাদে বুদ্ধির বা চিন্তার ছাপ থাকে।
০৫. সংগীত গান করা হয়, ছড়া আবৃত্তি করা হয়, মন্ত্র বলা হয়, ধাঁধা ধরা হয়, প্রবাদ বাক্যালাপে, বক্তৃতায় অথবা লেখায় প্রসঙ্গক্রমে উচ্চারিত হয়। প্রবাদের স্বাধীন সত্তা আছে, কিন্তু স্বাধীন প্রয়োগ নেই। প্রবাদ বক্তব্যকে তীক্ষ্ণ, যুক্তিকে জোরালো ও প্রকাশকে অর্থবহ করে তোলে।
০৬. প্রবাদের শিকড় ঐতিহ্যে প্রোথিত। ঐতিহ্য থেকে রস সঞ্চয় করে প্রবাদ অর্থপূর্ণ হয় ও ভাষার মধ্যে বহমান থেকে তাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

অর্থাৎ প্রবাদের অবয়ব ক্ষুদ্র হলেও এর একটি বিষয় আছে, অর্থ আছে। বিষয়টি রূপক-সংকেতের ভাষায় শব্দচিত্রে আরোপিত হয়, আর অর্থ হয় ব্যঞ্জিত। ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ এর নিহিতার্থ হলো, সাধারণ এক কাজ করতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক অন্য বড় বিষয়ের অবতারণা করা বা জড়িয়ে যাওয়া। ‘ধান ভানা’ ও ‘শিবের গীত’ দুটি বিপরীতধর্মী বাক্য দ্বারা এই অর্থ প্রকাশ করা হয়েছে। একইভাবে প্রবাদের আরেকটি উদাহরণ টানা যায়- ‘ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে।’ এর নিহিতার্থ হলো, অন্যের কৃতিত্বকে নিজের কৃতিত্ব বলে জাহির করা।

অন্যদিকে প্রবচন বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রবচনের যে বৈশিষ্ট্যগুলো নির্ধারণ করা হয়, তা হলো-

০১. প্রবচনে জাতির দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার কথা এক বা একাধিক বাক্যে সংহত রূপে প্রকাশিত হয়।
০২. সাধারণ গদ্যে অথবা অন্ত্যমিলযুক্ত ছন্দোবদ্ধ পদ্যে প্রবচন রচিত হয়।
০৩. প্রবচন মূলত বাচ্যার্থনির্ভর; এতে রূপক, প্রতীক, সংকেত, চিত্রকল্পের স্থান নেই।
০৪. প্রবচনের আবেদন প্রত্যক্ষ, সরস ও সহজবোধ্য।
০৫. প্রবাদ অপেক্ষা প্রবচন আকারে-প্রকারে বড় হয়। প্রবাদের অর্থের ধার বেশি, প্রবচনের অর্থের ভার বেশি।
০৬. প্রবচনের বিচিত্র অর্থ ধারণ ও বহন ক্ষমতা আছে। তবে এসব অর্থ একটি কেন্দ্রীয় ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ থাকে।
০৭. প্রবচন রচনায় স্বাধীনতা আছে; এজন্য এতে আবেগ, আনন্দ ও রসের স্থান আছে।

অর্থাৎ প্রবচন বাচ্যার্থনির্ভর; একটি একক বা কেন্দ্রীয় বক্তব্যকে অবলম্বন করে প্রবচন রচিত হয়। অন্ত্যমিল যুক্ত দুটো চরণ নিয়ে প্রধানত প্রবচনের অবয়ব গড়ে উঠে। এতে ছড়ার ছন্দের প্রাধান্য আছে। গদ্যাশ্রিত সরল ও যৌগিক বাক্যের প্রবচনও আছে। ছন্দ, চরণ, অন্ত্যমিল সহযোগে পদ্যের আঙ্গিক পরিলক্ষিত হলেও প্রবচন কবিতা নয়। মূলত শ্রুতিমধুর ও স্মৃতি-সুখকর করার জন্য প্রবচন পদ্যান্বিত হয়ে থাকে। কবিতা-পাঠের আনন্দ প্রবচনে নেই। লেখায়, বক্তৃতায় বা আলোচনায় উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত সময়ে প্রবচন উচ্চারণে আনন্দ নিহিত থাকে। ‘পরের ধনে পোদ্দারি, লোকে বলে লক্ষ্মীশ্বরী।’ এই প্রবচনটিতে কোন ব্যঞ্জনার্থ নিহিত নেই। বরং বাচ্যার্থ বা আরিক অর্থের মধ্যেই প্রবচনের বক্তব্য স্পষ্ট। অন্যের সম্পদ ভোগ-ব্যবহারের মাধ্যমে অহমিকা প্রদর্শনের প্রবণতাকে শ্লেষার্থে এই প্রবচনে সরস উপস্থাপন করা হয়েছে।

গবেষক ওয়াকিল আহমদ সেই চর্যাপদের কাল থেকে ব্যবহৃত প্রবাদ ও প্রবচনের নমুনাসহ আলোচনা করতে গিয়ে এই দুটি ধারার বাইরে আরেকটি ধারা হিসেবে বচন-এর যে মৃদু উল্লেখ করেছেন, তা আলাদাভাবে ব্যাখ্যা বা কোন সুনির্দিষ্ট বিবেচনার প্রয়োজন বোধ করেননি। বরং বচন আর প্রবচনের একাত্মতাই লক্ষ্য করি আমরা। তাঁর সংগৃহিত ও সংকলিত বিপুল সংখ্যক প্রবচনগুলোতে লক্ষ্য করলে জনভাষ্যে চড়ে আসা লোকায়ত ধারার সেইসব প্রবচনগুলোও সংরক্ষিত অবস্থায় দেখতে পাই, যেগুলো ইতোমধ্যে খনার বচন হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে। এবং এখানে এসেই আমাদেরকে আবারো পুরনো প্রশ্নে ফিরে যেতে হয়, তাহলে খনার বচনের প্রকৃত উৎসটা আসলে কোথায় ?

০৪.
‘মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা।’ এই প্রবচনটি উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে লেখাটা শুরু করা হয়েছিলো। এটি পূর্বোক্ত ‘নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা’ প্রকাশনীর ‘খনার বচন’ নামের ক্ষুদ্রাকৃতির বইটিতে মুদ্রিত ০২ ক্রমের উদ্ধৃত বচন। যদিও বইটিতে মুদ্রিত বচনের কোন সংখ্যাক্রম উল্লেখ করা হয়নি, কেবল প্রতি পৃষ্ঠায় একটি করে বচন মুদ্রিত রয়েছে। তবু আলোচনার সুবিধার্থে মুদ্রিত বচনের ধারাবাহিক ক্রমিক অবস্থানকেই ক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই বইয়ে সংকলিত বচনগুলোকে বলা হচ্ছে ‘খনার কৃষি ও ফল সংক্রান্ত বচন’। কিন্তু বচনগুলো যে সত্যিই খনা’র তার কোন উৎসের সন্ধান আমরা বইটি থেকে পাই না।

অন্যদিকে এপ্রিল ২০০৭-এ বইপত্র থেকে প্রকাশিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গবেষক ওয়াকিল আহমদ-এর ‘বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা’ গবেষণা গ্রন্থের ‘প্রবাদ ও প্রবচন’ অংশে সংগৃহিত ‘আবহাওয়া ও চাষবাস’ বিষয়ক প্রবচনের ৩৪২ নম্বরে উপরোক্ত প্রবচনটিকেই সংকলিত করা হয়েছে কোন নাম-পরিচয়হীন রচয়িতার লোকায়ত প্রবচন হিসেবে। বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে সংঘটিত অত্যন্ত শ্রমশীল গবেষণাকর্মের কোথাও, যদি কোন ভুল না করে থাকি, খনা নামটি চোখে পড়ে না।

একইভাবে ‘খনার বচন’ বইয়ের ২৪ ক্রমের ‘আমে ধান, তেঁতুলে বান’ বচন ‘বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা’ গ্রন্থের ৩৩১ নম্বরে আবহাওয়া ও চাষবাস বিষয়ক লোকায়ত প্রবচন হিসেবে সংকলিত। ৪৫ ক্রমের খনার বচন ‘তিন নাড়ায় সুপারি সোনা,/ তিন নাড়ায় নারিকেল টেনা,/ তিন নাড়ায় শ্রীফল বেল,/ তিন নাড়ায় গেরস্থ গেল।’ ওয়াকিল আহমদ-এর লোকায়ত প্রবচন সংগ্রহে ৩৩৯ নম্বরে সংকলিত। তদ্রূপ ২১ ক্রমের খনার বচন ‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ,/ ধন্য রাজা পুণ্য দেশ’ ওয়াকিল আহমদের ৩৪০ নম্বরে এসে একটু আগপর হয়ে সংকলিত হয়েছে ‘ধন্য রাজা পুণ্য দেশ,/ যদি বর্ষে মাঘের শেষ’ হিসেবে। আবার ৩৫ ক্রমের ‘তাল বাড়ে ঝোঁপে, খেজুর বাড়ে কোপে’ খনার বচনটিকে ওয়াকিল আহমদের ৩৩৮ নম্বরে কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত রূপে দেখতে পাই- ‘নারিকেল বাড়ে কোপে, তাল বাড়ে ঝোপে’ হিসেবে।

কোথাও কোথাও আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করা যায়। যেমন পূর্বোক্ত ‘খনার বচন’ বইয়ের ৩৮ ও ৭০ ক্রমের বচন দুটো হলো- ‘চৈত্রেতে খর খর,/ বৈশাখেতে ঝড় পাথর,/ জ্যৈষ্ঠতে তারা ফুটে,/ তবে জানবে বর্ষা বটে।’ এবং ‘জ্যৈষ্ঠে খরা আষাঢ়ে ভরা,/ শস্যের ভার সহে না ধরা’। ছেটেছুটে এ দুটো বচনেরই একটি সম্মিলিত রূপ আমরা দেখি ওয়াকিল আহমদের সংগৃহিত ‘আবহাওয়া ও চাষবাসভিত্তিক’ ৩৩৭ নম্বর লোকায়ত প্রবচনটিতে- ‘ চৈতে খর খর, বৈশাখে ঝড়-পাথর / জ্যৈষ্ঠে শুখো, আষাঢ়ে ধারা, / শস্যের ভার না সহে ধরা।’ তবে ফেব্রুয়ারি ২০০১-এ ‘গতিধারা’ থেকে প্রকাশিত ওয়াকিল আহমদের অন্য একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘লোককলা প্রবন্ধাবলি’র ‘বৃষ্টি-আবাহন ও বৃষ্টি-বারণ লোকাচার’ অধ্যায়ের এক জায়গায় আমরা খনার বচনের কথা উল্লেখ পাই এভাবে-

“ খনার বচনে আছে কৃষিকাজের বিবিধ রীতি-পদ্ধতি ও নিয়ম-নির্দেশ। হাল, চাষ, বলদ, ভূমি, বীজ, ফলন, বৃষ্টি, বন্যা, শিলা, ঝঞ্ঝা, মাস, ঋতু প্রভৃতি সম্মন্ধে জ্যোতিষী ব্যাখ্যা এগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়। বৃষ্টি ও আবহাওয়া সম্পর্কে রচিত বচনে সাধারণত বৃষ্টি, বন্যা, খরা, সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী থাকে-

চৈত্রেতে খর খর।
বৈশাখেতে ঝড় পাথর।।
জ্যেষ্ঠেতে তার ফুটে।
তবে জানবে বর্ষা বটে।।

অথবা

শনির সাত মঙ্গলের তিন।
আর সব দিন দিন।।
ভাদুরে মেঘ বিপরীত বায়।
সেদিন বৃষ্টি কে ঘোচায়।।

এই বর্ষা বৃষ্টি হলে কৃষক চাষ করবে, বীজ বুনবে, চারা রোপণ করবে, ফসল ফলাবে। বচনগুলো বাংলার ‘কৃষিদর্শন’।”

এখানে উদ্ধৃত বচন দুটোর উৎস সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- Tamonash Chandra Dasgupta Aspects of Bengali Society, from old Bengali Literature, Calcutta, 1935. p.23 ও পৃ.২৩৩। উল্লেখ্য, প্রথম বচনটি আমাদের পূর্বোক্ত ‘খনার বচন’ বইটির ৩৮ ক্রমে হুবহু উক্ত রয়েছে। তবে দ্বিতীয়টি সেখানে নেই।
হয়তো এভাবে অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে এমন আরো প্রচুর নমুনা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে না যে, এক জায়গায় যা গবেষকদের শ্রমলব্ধ সংগ্রহে লোকমুখে প্রচারিত নাম-পরিচয়হীন রচয়িতার লোকায়ত প্রবাদ বা প্রবচন হিসেবে সংগৃহিত হয়েছে, অন্যত্র তা-ই খনার বচন হিসেবে সংকলিত হয়ে আছে কোথাও। এই যেমন গবেষক ওয়াকিল আহমদেরই ‘বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা’ গবেষণা গ্রন্থের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক লোকায়ত প্রবচন সংগ্রহে ৩১৩, ৩১৭ ও ৩১৯ নম্বর প্রবচনগুলো হচ্ছে- ‘উনা ভাতে দুনা বল,/ অতি ভাতে রসাতল।’, ‘ঘোল, কুল, কলা- তিনে নষ্ট গলা।’ এবং ‘তপ্ত অম্ল, ঠাণ্ডা দুধ, যে খায় সে অদ্ভুত’। এগুলোই পূর্বে উল্লেখিত ‘খনার বচন’ বইয়ে যথাক্রমে ৯৫, ৪৮ ও ৭৭ ক্রমে সংকলিত রয়েছে। যদিও শেষোক্ত দুটো বচনকে সামান্য পরিবর্তিত চেহারায় দেখি আমরা এভাবে- ‘ঘোল, কুল, কলা- তিন নাশে গলা।’ এবং ‘তপ্ত অম্ল ঠাণ্ডা দুধ, যে খায় সে নির্বোধ।’ এখানে ‘নষ্ট’ শব্দের জায়গায় ‘নাশে’ এবং ‘অদ্ভুত’ শব্দের বদলে ‘নির্বোধ’ শব্দের প্রতিস্থাপন ঘটলেও বচন-প্রবচনের ভাব বা অর্থের কোন পরিবর্তন ঘটে নি।

এসব ঘটনা থেকে একটা বিষয় হয়তো আমাদের কাছে স্পষ্ট হতে থাকে যে, আমাদের লোকসাহিত্যের অত্যন্ত শক্তিশালী ধারা হিসেবে লোকায়ত প্রবাদ-প্রবচন সংগ্রহ ও সংকলনে আমাদের গবেষকরা যতোটা সাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন, খনার বচনের সম্ভাব্যতা নিয়ে বোধ করি ততোটা নিঃসন্দেহ হতে পারেন নি। তবে এ মন্তব্যকে কোনভাবেই মোক্ষম করার দুঃসাহস দেখানো হচ্ছে না এজন্যেই যে, বর্তমান লেখকের অপরিসীম সীমাবদ্ধতা কোনক্রমেই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার সন্দেহরেখা অতিক্রম করতে পারে নি। তবুও আপাত ধারণা থেকে এরকম প্রশ্নমুখর হওয়াটা হয়তো অসঙ্গত হবে না যে, খনার বচন নামে যে প্রবচনগুলো বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকলিত হয়েছে বা হচ্ছে, তা কি শুধুই শ্রুতিনির্ভর কোনো কিংবদন্তীয় গল্প-কাহিনী বা রূপকথা আশ্রিত কাল্পনিক আবেগ ? না কি এর পেছনে রয়েছে বিলুপ্ত কোন ইতিহাসনির্ভরতা ? ইতিহাসবেত্তা কোন লোক-গবেষকই তা ভালো বলতে পারবেন। প্রকৃত সত্য কী তা নিরসন না হওয়াতক খনা নামের কোন একক ব্যক্তি বা ব্যক্তিনীর অবস্থিতির বিপরীতে আমাদের সন্দেহের আঙুলটা নাহয় খাড়া হয়েই থাকলো।

০৫.
কিছু কিছু বচনকে সাধারণ জনেরা খুব সহজে এক ডাকেই খনার বচন হিসেবে চিহ্ণিত করে ফেলেন। কেননা বচনগুলোর গঠনরীতির মধ্যেই খনা নামটি উৎকীর্ণ থাকে। যেমন-

(ক)
‘খনা বলে শুন কৃষকগণ/ হাল লয়ে মাঠে বেরুবে যখন/ শুভ দেখে করবে যাত্রা/ না শুনে কানে অশুভ বার্তা।/ ক্ষেতে গিয়ে কর দিক নিরূপণ/ পূর্ব দিক হতে হাল চালন/ নাহিক সংশয় হবে ফলন।’
(খ)
‘খনা বলে শুনে যাও,/ নারিকেল মূলে চিটা দাও।/ গাছ হয় তাজা মোটা,/ তাড়াতাড়ি ধরে গোটা।’
(গ)
‘পূর্ণিমা অমাবস্যায় যে ধরে হাল,/ তার দুঃখ হয় চিরকাল।/ তার বলদের হয় বাত,/ তার ঘরে না থাকে ভাত।/ খনা বলে আমার বাণী,/ যে চষে তার হবে জানি।’
(ঘ)
‘খনা বলে চাষার পো,/ শরতের শেষে সরিষা রো।’
(ঙ)
‘বৎসরের প্রথম ঈষাণে বয়,/ সে বৎসর বর্ষা হবে খনা কয়।’
(চ)
‘উঠান ভরা লাউ শসা,/ খনা বলে লক্ষ্মীর দশা।’
(ছ)
‘খনা ডাকিয়া কন,/ রোদে ধান ছায়ায় পান।’
(জ)
‘ডাক দিয়ে বলে মিহিরের স্ত্রী, শোন পতির পিতা,/ ভাদ্র মাসে জলের মধ্যে নড়েন বসুমাতা।/ রাজ্য নাশে, গো নাশে, হয় অগাধ বান,/ হাটে কাটা গৃহী ফেরে কিনতে না পান ধান।’
(ঝ)
‘ষোল চাষে মূলা, তার অর্ধেক তুলা,/ তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান।/ খনার বচন, মিথ্যা হয় না কদাচন।’
(ঞ)
‘মাঘ মাসে বর্ষে দেবা,/ রাজায় ছাড়ে প্রজার সেবা।/ খনার বাণী,/ মিথ্যা না হয় জানি।’
(ট)
‘ধানের গাছে শামুক পা,/ বন বিড়ালী করে রা।/ গাছে গাছে আগুন জ্বলে,/ বৃষ্টি হবে খনায় বলে।’
(ঠ)
‘কচু বনে ছড়ালে ছাই,/ খনা বলে তার সংখ্যা নাই।’
(ড)
‘যে গুটিকাপাত হয় সাগরের তীরেতে,/ সর্বদা মঙ্গল হয় কহে জ্যোতিষেতে।/ নানা শস্যে পরিপূর্ণ বসুন্ধরা হয়,/ খনা কহে মিহিরকে, নাহিক সংশয়।’

[খনার বচন/ নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা/ ঢাকা/ পঞ্চম সংস্করণ ২০০৭]

বাক্যের গাথুনিতেই যেহেতু খনা শব্দটি জুড়ে দেয়া হয়েছে, ফলে এগুলোকে যে কেউ খনার বচন বলতেই পারেন। তাই বলে এটা প্রমাণসিদ্ধ হয়ে যায় না যে বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় দশম রত্ন হিসেবে একমাত্র খনা নাম্নী কোন বিদূষী জ্যোতিষশাস্ত্রী রমণীর মুখনিঃসৃত বাণী এগুলো। এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ইতিহাসবেত্তাদের এদিকে মনোযোগ আকর্ষিত হওয়াটাও জরুরি বৈকি।

মহাকবি বেদব্যাস রচিত এযাবৎ প্রাচীনতম মহাকাব্য মহাভারতের পৌরাণিক চরিত্র শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত উপদেশবাণী হিসেবে শ্রীমদ্ভাগবত গীতা ব্যবহারিক মূল্য বিবেচনায় নির্দিষ্ট একটি ধর্মগোষ্ঠির কাছে ধর্মগ্রন্থের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। এখানে ইতিহাসনিষ্ঠতার বদলে ধর্মভীরু একটি জনগোষ্ঠির কিংবদন্তীতুল্য অলৌকিকতায় বিশ্বাসেরই প্রাধান্য দেখতে পাই আমরা। তবে লিপিবদ্ধ ও বহুলচর্চিত সাহিত্য হিসেবে গীতায় যেমন শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণীরূপের এদিক ওদিক বা সংযোজন-বিয়োজনের কোন সুযোগ সাধারণভাবে নেই, লোকায়ত কিংবদন্তীয় চরিত্র খনা’র বিষয়টা মনে হয় ঠিক তার উল্টো হওয়াটাই দারুণভাবে সম্ভব। আর তাই কৃষিসম্পৃক্ত প্রাচীন সমাজে আমাদের বহু অখ্যাত লোক-কবিদের সৃজনশীল মেধায় উপরোক্ত ধরনের এরকম খনার বচন তৈরি হওয়াটা অসম্ভব বা বিচিত্র কিছু নয়। ফলে আমাদেরকে আবারো সেই একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে হচ্ছে- খনার বচন আসলে কী ?

লোক-সংস্কৃতির চিরায়ত ধারায় এমন কিছু গীত-রীতির কথা আমরা জানি যা বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্ণিত হয়ে থাকে। যেমন জারি, সারি, ধামাল, গম্ভিরা, ভাওয়াইয়া ইত্যাদি। উদাহরণ হিসেবে রাজশাহী অঞ্চলের গম্ভিরার কথাই ধরি। নাম না জানা বিভিন্ন গীতিকারের নির্দিষ্ট রীতি ও সুরে লেখা গীতের লোকায়ত সমাহার এই গম্ভিরার ধরনে আজকাল অনেক আধুনিক কবি ও গীতিকারের লেখা গানও গম্ভিরার সুরে অনেক শিল্পীরা গেয়ে থাকেন। এগুলোকে আমরা গম্ভিরাই বলে থাকি। রংপুর অঞ্চলের ভাওয়াইয়া বা সিলেট অঞ্চলের ধামাল গানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রচয়িতার নাম জানা থাকলে গীতিকার হিসেবে তাঁর নাম চলে আসে, নইলে বলা হয় সংগৃহিত; অর্থাৎ লোকায়ত উৎস। সেই লোকায়ত উৎসটা যে কোন অচেনা একক রচয়িতাই হবেন তা কিন্তু নয়। খনার বচনের ক্ষেত্রেও এমনটা হওয়া কি অসম্ভব খুব ? খনার বচনকে এরকম সুনির্দিষ্ট একটা প্রবচন রীতি হিসেবে কল্পনা করাটা কি খুব কষ্টকর ?

০৬.
খনার বচন হিসেবে পরিচিত বা পরিবেশিত প্রবচনগুলোর উৎস প্রমাণীত বা অপ্রমাণীত যা-ই হোক, এগুলোর একটা ভাব-রীতি বা ধরণ ইতোমধ্যে চিহ্ণিত হয়ে আছে যে, “খনার বচনে আছে কৃষিকাজের বিবিধ রীতি-পদ্ধতি ও নিয়ম-নির্দেশ। হাল, চাষ, বলদ, ভূমি, বীজ, ফলন, বৃষ্টি, বন্যা, শিলা, ঝঞ্ঝা, মাস, ঋতু প্রভৃতি সম্মন্ধে জ্যোতিষী ব্যাখ্যা এগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়। বৃষ্টি ও আবহাওয়া সম্পর্কে রচিত বচনে সাধারণত বৃষ্টি, বন্যা, খরা, সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী থাকে।… এই বর্ষা বৃষ্টি হলে কৃষক চাষ করবে, বীজ বুনবে, চারা রোপণ করবে, ফসল ফলাবে। বচনগুলো বাংলার ‘কৃষিদর্শন’।” …[পৃ.১৭৫, ওয়াকিল আহমদ/ লোককলা প্রবন্ধাবলি/ গতিধারা, ফেব্রুয়ারি ২০০১]

এ পর্যায়ে এসে তাহলে এ প্রশ্ন আসাটা কি খুব অস্বাভাবিক যে, এই বচনগুলোর নাম আবহাওয়া বা কৃষি বচন না হয়ে খনার বচন হলো কেন ? খনার বচন তো আসলে আবহাওয়া বা কৃষি বচনই। তবু তাকে কেন খনার বচন বলা হয় এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা কি আপাতভাবে কয়েকটি সম্ভাবনা বিবেচনায় নিতে পারি ?

দার্শনিক মিল বলতেন- নাথিং হ্যাপেনস উইদাউট অ্যা কজ। প্রতিটা ঘটনার পেছনেই একটি কারণ রয়েছে। সংঘটিত কোন ঘটনার কার্য-কারণ খোঁজা মানুষের আদিমতম কৌতুহলেরই অংশ। অজানাকে জানা বা জ্ঞানন্বেষণের এই আদিম প্রবণতার ধারাবাহিকতাই মূলত মানুষের চিরায়ত সমকালীনতা। হাজার বছর আগের বা আজকের অবস্থানে মৌলিক কোন তফাৎ নেই, মাত্রাগত ভিন্নতাটুকু ছাড়া। আর এই মাত্রাগত অবস্থাটা হলো মানব প্রজাতি কর্তৃক জাগতিক রহস্য উন্মোচন বা জ্ঞান বিকাশের তুলনামূলক অবস্থান। মানুষের জ্ঞানের জগতে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরার কালের সমকালীনতায় পৌঁছা এবং সেখান থেকে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরার কালের সমকালীনতা পর্যন্ত হেঁটে আসতে মানব সভ্যতার মাত্রাগত অবস্থানের যে তুলনামূলক পরিবর্তন সাধিত হয়ে এসেছে, এরই ধারাবাহিকতায় কত ভাঙাগড়া কত পট পরিবর্তন ঘটে গেছে মানব সভ্যতায়। এগুলোই হয়তো ইতিহাসের নুড়ি-পাথর। এই কার্য-কারণ সম্পর্ক খুঁজতে খুঁজতেই মানুষের বা সভ্যতার এগিয়ে যাওয়া। এক বিশ্বাস থেকে আরেক বিশ্বাসে পদার্পণ, আবার পুরনো অকার্যকর হয়ে ওঠা সে বিশ্বাসকেও ছুঁড়ে ফেলে অন্য কোন আধুনিক বিশ্বাস বা মতবাদ আঁকড়ে নেয়া। তাই জাগতিক ঘটনাবলির কার্য-কারণ খোঁজার ইতিহাসই মূলত মানব সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাস। এসব করতে গিয়ে মানুষ কোন কার্য-কারণ সম্পর্কের যে আপাত ব্যাখ্যা তৈরি করে, সেটা করে তার সমকালীন জ্ঞানের স্তর বা বিন্যাস দিয়ে। সভ্যতা ক্রমশই এগিয়ে যায় বলে একশ’ বছর আগের ব্যাখ্যা আর আজকের ব্যাখ্যা তাই এক থাকে না, থাকতে পারে না।

জগতের যে ঘটনাগুলো মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে না, তার কার্য-কারণ সম্পর্ক খুঁজতে গিয়ে সমকালীন আহরিত জ্ঞান দিয়েও যখন পরিপূর্ণভাবে তার রহস্য উন্মোচন করতে ব্যর্থ হয়, তখনই সে আশ্রয় নেয় কল্পনার বা কাল্পনিক ধারণা সৃষ্টির। আর এগুলোকে অদ্ভুতভাবে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্যে যে সন্তোষজনক যুক্তির প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাকে পরিতৃপ্ত করতেই জন্ম নেয় কতকগুলো লোককথা, উপকথা, পুরাণ বা রূপকথার। আমাদের প্রচলিত ধর্মীয় কাহিনীগুলো এই পর্যায়ের বলে জাগতিক ঘটনাবলির কার্য-কারণ সম্পর্কের তৎকালীন ধর্মীয় ব্যাখ্যার সাথে মানব সভ্যতার হেঁটে হেঁটে অনেকদূর এগিয়ে আসা আধুনিক ব্যাখ্যার বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে আজ। এরকমই আরেকটি বিষয় হলো তথাকথিত জ্যোতিষশাস্ত্র।

অজানার প্রতি মানুষের নিরাপত্তাহীনতার ভয় বা সন্দেহ চিরকালের। বিশাল প্রকৃতির মহাজাগতিক ক্ষমতার কাছে নিতান্তই অসহায় মানুষের এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকেই মনোজগতে জন্ম নেয়া শুভ-অশুভ জাতীয় সংস্কারগুলো জাগতিক সকল ক্রিয়াকর্মে বিপুল প্রভাব বিস্তার করে মানুষকে করে তুলেছে অদৃষ্টবাদী। এই অদৃষ্টবাদিতাই হলো তথাকথিত জ্যোতিষশাস্ত্রের আসল পুঁজি। দৃশ্যমান গ্রহ-নক্ষত্রের আপেক্ষিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক শক্তি তথা আবহাওয়া ও জলবায়ুর মধ্যের আন্ত-সম্পর্কের যে নিয়মতান্ত্রিকতা, দীর্ঘকালীন পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে মানুষের আহরিত জ্ঞানে এ সত্য ধরা পড়েছে খুব স্বাভাবিকভাবেই। আর তাই এই সত্যের সাথে কাল্পনিক শুভ-অশুভের অলৌকিক সংস্কার যুক্ত হয়ে গড়ে ওঠা জ্যোতিষশাস্ত্রই নিয়ন্ত্রণ করেছে এতদঞ্চলের তৎকালীন মানুষের মনোভূমি। এছাড়া কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় প্রকৃতি ও জলবায়ুর সাথে মানুষের সম্পর্ক এমনিতেই গভীর। এই প্রকৃতিনির্ভরতা মানুষকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছে জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট শুভ অশুভ পরিণতিগুলোর প্রতি। ফলে ‘যদি হয় চৈতে বৃষ্টি, তবে হবে ধানের সৃষ্টি।’ বা ‘আখ, আদা, পুঁই, এই তিনে চৈতি রুই’ জাতীয় কৃষিদর্শনভিত্তিক প্রবচনের সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এবং সাথে ‘সোম ও বুধে না দিও হাত, ধার করিয়া খাইও ভাত’ বা ‘মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা’ জাতীয় শুভ-অশুভ শঙ্কা মিশ্রিত অলৌকিক সংস্কার জাতীয় প্রবচনগুলোও প্রভাব বিস্তার করেছে ধর্মীয় রূপকথার আদলে। কিন্তু একটি নিরক্ষর কৃষিভিত্তিক সমাজে এসব লৌকিক জ্ঞানের ব্যবহারিক শৃঙ্খলা আনয়নে সুনির্দিষ্ট কিছু রীতি মেনে চলায় বাধ্য করার সাবলীল প্রক্রিয়া হলো ধর্মগাথার আদলে কাল্পনিক কোন মনোশাসক সৃষ্টি, যা একাধারে হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য ও আকর্ষণীয়। এরই বহিঃপ্রকাশ হয়তো উপকথার আদলে একজন লীলাবতী বা বিদুষী খনা নামের কিংবদন্তীয় কোন জ্যোতিষশাস্ত্রীর লোককাহিনীর সৃষ্টি ও এর ব্যাপ্তি। যথাযথ সময়ে যে কিনা কৃষিসম্পৃক্ত কোন প্রাজ্ঞ চাষার মুখ দিয়ে বলতে পারে- ‘বাঁশের ধারে হলুদ দিলে,/ খনা বলে দ্বিগুণ বাড়ে।’ কিংবা ‘শুনরে বাপু চাষার বেটা,/ মাটির মধ্যে বেলে যেটা,/ তাতে যদি বুনিস পটল,/ তাতে তোর আশার সফল’ ইত্যাদি। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যরহিত কোন কাল্পনিক রূপকথা বা কিংবদন্তী নির্ভর ধারণা থেকে চূড়ান্ত কোন অনুসিদ্ধান্ত টানা হয়তো পরিমিত বিবেচনার প্রমাণ রাখে না।

আরেকটি সম্ভাবনা ও যুক্তিকে এক্ষেত্রে বেশ জোরালো মনে হতে পারে। তা হচ্ছে, খনা কোন ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়, প্রবচনের একটি বিশেষ রীতি বা ধারার নাম হলো খনার বচন। আর এই রীতি বা ধারাটি কী, তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবু খনা শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করে আমরা এর একটি অনুমান খুঁজে নেয়ার চেষ্ট করতে পারি।

‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ গ্রন্থে ‘খনা’ শব্দের দুটো অর্থ চিহ্ণিত করা হয়েছে। একটি হচ্ছে বিশেষণবাচক- নাকি সুরে কথা বলে এমন। অন্যটি বিশেষ্যবাচক এবং সেই রূপকথা আশ্রিত- বিখ্যাত বাঙালি মহিলা জ্যোতিষী; মিহিরের স্ত্রী। উক্ত অভিধানে খনার বচনের বিশেষ্যবাচক অর্থটি করা হয়েছে এভাবে- জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী চাষাবাদ, বৃক্ষরোপণ, গৃহনির্মাণ প্রভৃতি শুভাশুভ বিষয়ক সুপ্রচলিত প্রবচন যা খনার রচিত বলে প্রসিদ্ধ।

অর্থাৎ খনার বচনের একটি সুনির্দিষ্ট রীতি বা ধরন ইতোমধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী চাষাবাদ, বৃক্ষরোপণ, গৃহনির্মাণ, আবহাওয়া, জলবায়ু প্রভৃতি বিষয়সংশ্লিষ্ট শুভাশুভ বিষয়ক সুপ্রচলিত প্রবচনই খনার বচন। এক্ষেত্রে সংশয়ের কোন কারণ দেখি না। সংশয়ের কারণ থেকে যায় শুধু খনা শব্দ বা নামের যৌক্তিক উৎস নিয়েই। সম্ভবত এরও একটি চমৎকার সম্ভাব্যতা যাচাই করে নিতে পারি আমরা।
খনা (খন্ + আ) শব্দের মৌল শব্দ হচ্ছে খন। উল্লেখিত বাংলা অভিধানে এই ‘খন’ শব্দেরও দুটো ভিন্ন কিন্তু পরস্পর সম্পর্কযুক্ত অর্থ চিহ্ণিত রয়েছে। একটি হলো- ক্ষণ শব্দের কোমল রূপ। আর ‘ক্ষণ’ অর্থ দেয়া আছে ‘মুহূর্ত’ অভিধানে খন শব্দের অন্য অর্থটি মুদ্রিত আছে এভাবে- ভবিষ্যৎ অর্থবোধক (হবে’খন, দেখব’খন)। {‘এখন’ শব্দের ‘এ’ লোপে; স. ক্ষণ}।
উপরোক্ত বিবেচনায় এখন ‘খনা’ শব্দটির ক্রিয়া-বিশেষণবাচক একটি লোকায়তিক অর্থ যদি এভাবে করা হয়, ভবিষ্যতের কোন বিশেষ (শুভাশভ) মুহূর্ত, কোথাও কি ভুল হবে ? যদি ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে ‘খনার বচন’ শব্দযুগলের একটি বাচ্যার্থ দাঁড়ায় এরকম, যে বচনের মধ্য দিয়ে কোন বিষয়ের ভবিষ্যৎ শুভাশুভ মুহূর্ত নির্দেশিত হয় বা হয়েছে, তা-ই খনার বচন। ফলে আরো কিছু প্রশ্নেরও ধারণাগত যৌক্তিক ব্যাখ্যা পেয়ে যেতে পারি আমরা। খনার বচন যে কেবল খনা নামধারী সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিবিশেষেরই রচিত হতে হবে তা নয়। হতে পারে বিজ্ঞ কিছু নিরক্ষর লোক-চাষার। অথবা প্রাচীন কৃষিদর্শন-অভিজ্ঞ কিছু লোক-কবির। বা কৃষিনির্ভর কিছু চতুর ও প্রাজ্ঞ জ্যোতিষীর। তবে এ বচনগুলো যে বিভিন্ন কালের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনের মুখে মুখে ছড়া কাটার মতোই একগুচ্ছ লোকায়ত ভবিষ্যৎ বাণী, তাতে বোধকরি দ্বিমত করার খুব জোরালো অবকাশ থাকবে না। খনার বচনের সবগুলো প্রবচন হয়তো এখনো সংগ্রহ করা সম্ভব হয় নি বা খনার বচনের প্রকৃত সংখ্যাও সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণীত করা সম্ভব নয়। তবু খনার বচনের সেই সব বচন রচয়িতাকে যদি আমরা ‘খনা’ নামেই চিহ্ণিত করি, তাহলে বলতেই হয়, খনা হচ্ছে জনভাষ্যে মিশে থাকা আমাদের একগুচ্ছ লোক-ভাষ্যকার।

Friday, December 11, 2009

খনা কাহিনী - ৩

প্রচলিত গল্পে খনা ছিলেন লঙ্কাদ্বীপের রাজকুমারী। মতান্তরে রাক্ষসকবলিত কোনো এক রাজ্যের অনিন্দ্যসুন্দর রাজকুমারীর নাম ছিল লীলাবতী যিনি পরে খনা নামে পরিচিত হন। খনা অর্থ বোবা এবং জিহ্বা কর্তনের পর নামটি প্রতিষ্ঠা পায়। কথিত আছে, জ্যোতিষশাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানের ফলে খনা প্রায়ই রাজসভাতে আমন্ত্রিত হতেন। ফলে প্রতিহিংসাপরায়ণ শ্বশুর বরাহ মিহির ছেলে মিহিরকে লীলাবতীর জিহ্বা কাটার নির্দেশ দেন। বাবার নির্দেশে মিহির খনার জিহ্বা কর্তন করেন। তবে গল্পমতে কথিত রাজকন্যা স্বামীর কাছে অনুরোধ করেন যে, জিহ্বা কর্তনের আগে কিছু বলতে চান। স্বামী অনুমতি দেন। এ সময় খনা আবাদ, বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, যাত্রা, গবাদি, শস্যাদি, ফলাদি, গ্রহ-নক্ষত্রাদি সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত বচন দেন যা পরে খনার বচন নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়। খনার বচন সবচেয়ে বেশি প্রচলিত কৃষক সামজে; যাদের কোনো লিখিত ভাষা নেই। মুখে মুখে প্রচলিত এসব ভাষা যুগ যুগ ধরে তাদের কৃষিকাজ এবং জীবনাচারে প্রভাবিত হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে সোজা চোখে না দেখলেও খনার বচন তার অবশ্যম্ভাব্যতা থেকে কক্ষচ্যুত হয়নি। বরং গ্রামের কৃষকরা বিজ্ঞানের ভাষার চেয়ে প্রবাদ-প্রবচনে অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তবে অনেক বিজ্ঞজন খনার বচনকে আধুনিক বিজ্ঞান হিসেবে অভিহিত করতে গিয়ে প্রবচনগুলো খনার বিজ্ঞান হিসেবে অভিজ্ঞান করেন। বচনগুলো অষ্টম অথবা নবম শতাব্দীতে রচিত। তবে আজো তা নির্ভুল ও সূক্ষ্মদৃষ্টিসম্পন্ন নীতিবাক্য হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। যেখানে ঋতুভেদে শস্য উৎপাদন, আবহাওয়ার উপলব্ধি সন্নিবেশিত হয়েছে এবং মাঝে মাঝে ভবিতব্য নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে চলেছে।
‘যদি বর্ষে আগনে/রাজা যায় মাগনে/ যদি বর্র্ষে পুষে/ কড়ি হয় তুষে/যদি বর্ষে মাঘের শেষ/ধন্য রাজা পুণ্য দেশ’ অর্থাৎ যদি অগ্রহায়ণে বৃষ্টি হয় তবে দুর্ভিক্ষে রাজাকে ভিক্ষা করতে হবে। পৌষ মাসে বৃষ্টি হলে তুষ বিক্রি করেও টাকা হয়, আর মাঘের শেষ দিন বৃষ্টি হলে রাজার ভা-ার শস্যে পূর্ণ হয়। কিংবা ‘যত জ্বালে ব্যঞ্জন মিষ্ট/তত জ্বালে ভাত নষ্ট’ অর্থাৎ মিষ্টি যত জ্বালানো যাবে তত ভালো, আর ভাত যত জ্বাল দেয়া যাবে তত নষ্ট হবে।
খনা তার প্রবাদে মাঝে মাঝে প্রাচীন ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেছেন। শুভ-অশুভ দিনক্ষণ নিয়ে ভবিষ্যতের কথা চিরন্তন ভাষায় বলেছেন। ‘যদি না হয় আগনে বৃষ্টি/তবে না হয় কাঁঠালের সৃষ্টি’ অর্থাৎ অগ্রহায়ণে বৃষ্টি না হলে কাঁঠালের ফলন ভালো হবে না।
কৃষিকাজে খনার বচনে অনেক নির্দেশনা আছে যা আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। ‘হাত বিশ করি ফাঁক/আম কাঁঠাল পুঁতে রাখ’ কিংবা ‘গাছগাছালি ঘন সবে না/গাছ হবে তার ফল হবে না’ কিংবা ‘খনা ডেকে বলে যান/ রোদে ধান ছায়ায় পান’ কিংবা ‘ষোল চাষে মুলা/ তার অর্ধেক তুলা/তার অর্ধেক ধান/ বিনা চাষে পান।’ গবাদিপশু নিয়ে খনা অনেক অনুভূতিপ্রবণ বচন রচনা করেছেন। ‘যে চাষা খায় পেট ভরে/গরুর পানে চায় না ফিরে/গরু না পায় ঘাস পানি/
ফলন নাই তার হয়রানি’ কিংবা ‘গরুর পিঠে তুললে হাত/ গিরস্তে কবু পায় না ভাত।’ প্রকৃতিবিষয়ক প্রবচনে তিনি মানুষের জন্য সাবধান বার্তা ঘোষণা করেছেনÑ ‘আলো হাওয়া বেঁধো না/রোগে ভোগে মরো না।’
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের ‘ঊধৎষু ঃড় নবফ, ধহফ বধৎষু ঃড় ৎরংব, সধশবং ধ সধহ যবধষঃযু, বিধষঃযু ধহফ রিংব’ সেই বিখ্যাত উক্তির বহু আগে খনা লিখে গেছেনÑ ‘সকাল শোয় সকাল ওঠে/তার কড়ি না বৈদ্য লুটে’ অর্থাৎ যে আগে শয্যায় যায় এবং আগে শয্যা পরিত্যাগ করে তার জন্য ডাক্তারের প্রয়োজন হয় না। এবং সব সমালোচনার উত্তর আছে। বর্তমানে বাংলাদেশে চালু হওয়া ‘উধুষরমযঃ ংধারহম ঃরসব’ পদ্ধতিও তার সমর্থক।
লেখাটি পদ্মা পাড়ের মানুষ থেকে নেওয়া

খনা কাহিনী - ২

'খনা' বাংলার লোকজীবন সম্পর্কে অনেক ভবিষ্যত বাণী করেছেন যা খনার বচন নামে পরিচিত। বচন গুলোতে আবহাওয়া , জ্যোতিষ ও ভু-তত্ব ভেদে শস্যের ক্ষয়ক্ষতি ও ফলন সম্পর্কে যে ধারণা দেয়া হয়েছে তার অনেকগুলোই বানীক সত্যের খুব কাছাকাছি। খনার উপদেশ গুলো দীর্ঘকাল বাংলার আবহাওয়া ও কৃষিকাজের দিকনির্দেশক হিসেবে আজও কাজ করছে।
খনা- নামটির সাথে যতটা পরিচিত বাংলার মানুষ ততটা অপরিচিত তার যাপিত জীবন সম্পর্কে। অনেকেই হয়ত জানেন না যে খনা ছিলেন একজন নারী। আ্যস্ট্রলজিতেও তার পারদর্শিতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। কিন্তু ধীরে ধীরে বচন রচয়িতা হিসেবে এক বিদুষী নারীতে পরিনত হন খনা। খনার আবির্ভাব সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা নেই তবে অনেকে বলেন ১২০০ খ্রীষ্টাব্দের মাঝামাঝি তাঁর আগমন ঘটেছিল। তাঁর ব্যাক্তিগত পরিচয়ও লোকসাহিত্য নির্ভর এবং সেক্ষেত্রে অনেক দ্বীমতও রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে এক কিংবদন্তি অনুযায়ী তাঁর নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাতের দেউলি গ্রামে। শোনা যায় তাঁর পিতার নাম ছিল অনাচার্য । জীবনের অনেক খানি সময় বাস করেন সে সময়কার চন্দ্রকেতু রাজার আশ্রম চন্দ্রপুরে।
সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অপর এক কিংবদন্তি অনুসারে খনা ছিলেন সিংহলরাজের কন্যা। ভক্ষনে জন্মগ্রহণ করায় তাঁর নাম রাখা হয় ক্ষনা বা খনা। তখন বিক্রমপুরের রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহপুত্র মিহিরের জন্ম লাভের পর গণনা করে দেখেনযে তাঁর আয়ু মাত্র এক বছর। তাই পুত্রকে তিনি একটি পাত্রে করে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেন। পাত্রটি ভাসতে ভাসতে সিংহল দ্বীপে পৌঁছায় এবং লালন পালন শেষে সিংহল রাজা যুবক মিহিরকে খনার সাথে বিয়ে দেন। সেখানে ধীরে ধীরে মিহির ও খনা জ্যোতিষ শাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন। এরপর মিহির সস্ত্রীক নিজভূমে তাঁর পিতার কাছে ফিরে আসেন এবং একসময় রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাসদ হন এবং পিতার ন্যায় জ্যোতিষশাস্ত্রে প্রতিপত্তি লাভ করেন। একদিন পিতা-পুত্র আকাশের তারা গণনায় সমস্যায় পড়েন। আমাদের বুদ্ধিমতী খনা সেই সমস্যার সমাধান করে রাজা বিক্রমাদিত্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এতে রাজসভায় প্রতিপত্তি হারানোর ভয়ে পিতার আদেশে মিহির খনার জীহ্বা কেটে দেন! এর কিছুকাল পরে খনার মৃত্য ঘটে। কথিত আছে খনার জীহ্বা কেটে নেয়ার জন্য তাঁর শাশুড়ির সাথে দ্বন্দই বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
খনার বচন বাংলার লোক সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যান্ত্রীক জীবনের চরম জটিলতা আর পাশ্চাত্যের দূষিত হাওয়া আমাদের ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে । ভুলে যাচ্ছি আমাদের কিংবদন্তিতুল্য কেবলমাত্র লোকের মুখে মুখে প্রচারিত হয়ে আসা এক বিদূষী নারী খনাকে, যিনি নিজের এক জীহ্বার বিনিময়ে নিজের কথা ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলার কোটি কোটি মানুষের জীহ্বায়। যুগ যুগ ধরে মানুষেরা খনার বচন প্রকাশ করে চলেছেন নিজের জীহ্বা দ্বারা!
লেখাটি বাঁধ ভাঙার আওয়াজ থেকে নেওয়া

খনা কাহিনী - ১

খনা বা ক্ষণা কথিত আছে তার আসল নাম লীলাবতী আর্যা জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এক বিদুষী নারীর যিনি বচন রচনার জন্যেই বেশি সমাদৃত, মূলত খনার ভবিষ্যতবাণীগুলোই খনার বচন নামে বহুল পরিচিত। মনে করা হয় ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তার আবির্ভাব হয়েছিল। কিংবদন্তি অনুসারে তিনি বাস করতেন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিস পরগনা জেলার বারাসাতের দেউলিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম ছিন অনাচার্য। অন্য একটি কিংবদন্তি অনুসারে তিনি ছিলেন সিংহলরাজের কন্যা। বিক্রমপুরের রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজ সভার প্রখ্যাত জোতির্বিদ বরাহপুত্র মিহিরকে খনার স্বামীরূপে পাওয়া যায়।
খনার বচন মূলত কৃষিতত্ত্বভিত্তিক ছড়া। আনুমানিক ৮ম থেকে ১২শ শতাব্দীর মধ্যে রচিত। অনেকের মতে খনা নাম্নী জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এক বিদুষী বাঙালি নারীর রচনা এই ছড়া গুলো। তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে। অজস্র খনার বচন যুগ যুগান্তর ধরে গ্রাম বাংলার জন জীবনের সাথে মিশে আছে। জনশ্রুতি আছে যে, খনার নিবাস ছিল চব্বিশ পরগণা র তৎকালীন বারাসাত মহকুমার দেউলি গ্রামে। এমনকি রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার নবরত্নের একজন বলে কথিত বরাহমিহির বা বররুচি এর পুত্র মিহির তার স্বামী ছিল বলেও কিংবদন্তী আছে। এই রচনা গুলো চার ভাগে বিভক্ত।কথিত আছে বরাহ তার পুত্রের জন্ম কোষ্ঠি গননা করে পুত্রের আয়ূ এক বছর দেখতে পেয়ে শিশু পুত্র মিহিরকে একটি পাত্রে করে সমুদ্র জলে ভাসিয়ে দেন। পাত্রটি ভাসতে ভাসতে সিংহল দ্বীপে পৌছলে সিংহলরাজ শিশুটিকে লালন পালন করেন এবং পরে কন্যা খনার সাথে বিয়ে দেন। খনা এবং মিহির দু'জনেই জ্যোতিষশাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। মিহির একসময় বিক্রমাদিত্যের সভাসদ হন। একদিন পিতা বরাহ এবং পুত্র মিহির আকাশের তারা গণনায় সমস্যায় পরলে, খনা এ সমস্যার সমাধান দিয়ে রাজা বিক্রমাদিত্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। গণনা করে খনার দেওয়া পূর্বাভাস রাজ্যের কৃষকরা উপকৃত হতো বলে রাজা বিক্রমাদিত্য খনাকে দশম রত্ন হিসেবে আখ্যা দেন। রাজসভায় প্রতিপত্তি হারানোর ভয়ে প্রতিহিংসায় বরাহের আদেশে মিহির খনার জিহ্বা কেটে দেন। এর কিছুকাল পরে খনার মৃত্যু হয়।
•কৃষিকাজের প্রথা ও কুসংস্কার।
•কৃষিকাজ ফলিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান।
•আবহাওয়া জ্ঞান।
•শস্যের যত্ন সম্পর্কিত উপদেশ।

বরাহমিহির প্রাচীন ভারতের (আনুমানিক ৫০৫ - ৫৮৭) একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং কবি। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়াও গণিতশাস্ত্র, পূর্তবিদ্যা, আবহবিদ্যা, এবং স্থাপত্যবিদ্যায় পণ্ডিত ছিলেন।
এই মনীষীর জন্ম ভারতের অবন্তিনগরে। রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার নবরত্নের অন্যতম হিসেবে তিনি স্বীকৃত। ভারতীয় পঞ্জিকার অন্যতম সংস্কারক ছিলেন তিনি। তিনিই বছর গণনার সময় বেশাখকে প্রথম মাস হিসেবে ধরার প্রচলন করেন। আগে চৈত্র এবং বৈশাখকে বসন্ত ঋতুর অন্তর্গত ধরা হতো। পৃথিবীর আকার এবং আকৃতি সম্বন্ধে তার সঠিক ধারণা ছিল। তার জন্ম ৫৮৭ ধরা হলেও কারও কারও মতে তা ৫৭৮।
তার রচিত বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:

•পঞ্চসিদ্ধান্তিকা; ৫৫০ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয়। পাঁচটা খন্ড নিয়ে গঠিত এই বইটিকে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের সংক্ষিপ্তসার বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে। পাঁচটি খন্ড হচ্ছ: সূর্যসিদ্ধান্ত, রোমকসিদ্ধান্ত, পৌলিশসিদ্ধান্ত, পৈতামহসিদ্ধান্ত এবং বাশিষ্ঠসিদ্ধান্ত। আরব দার্শনিক আল খোয়ারিজমি সূর্যসিদ্ধান্ত দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আল জিবর ব আল মুকাবলা রচনা করেন বলে মনে করা হয়।
•বৃহৎসংহিতা; একটি প্রসিদ্ধ জ্যোতিষ গ্রন্থ যা পদ্য আকারে লিখা। এতে তিনি জ্যোতিষী দৃষ্টিকোণ থেকে বহু পাথরের বিবরণ এবং পাক-ভারতের ভৌগলিক তথ্য সন্নিবেশিত করেন। এছাড়াও এতে সূর্য ও চন্দ্রের গতি ও প্রভাব, আবহবিদ্যা, স্থাপত্য এবং পূর্তবিদ্যার নানা বিষয় প্রসঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তার কথা আলোচিত হয়েছে। এই বইয়েই তিনি ব্রজলেপ নামে একটি বস্তুর প্রস্তুতপ্রণালী ব্যাখ্যা করেছেন যা আধুনিককালের সিমেন্টের সমগোত্রীয় ছিল। সে সময় ভারতে বরাহমিহির উদ্ভাবিত এই ব্রজলেপ দিয়েই বড় বড় দালান কোঠার ইটের গাঁথুনি তৈরীতে ব্যবহৃত হতো।
এই লেখাটি উইকিপিডিয়া হতে নেওয়া।

Monday, October 19, 2009

খনার বচন

খনার বচন মূলত কৃষিতত্ত্বভিত্তিক ছড়া। আনুমানিক ৮ম থেকে ১২শ শতাব্দীর মধ্যে রচিত। অনেকের মতে খনা নাম্নী জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এক বিদুষী বাঙালি নারীর রচনা এই ছড়া গুলো। তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে। অজস্র খনার বচন যুগ যুগান্তর ধরে গ্রাম বাংলার জন জীবনের সাথে মিশে আছে।
 ১.
চাষে মুলা তার

অর্ধেক তুলা তার
অর্ধেক ধান
বিনা চাষে পান
২.
বিপদে পড় নহে ভয়

অভিজ্ঞতায় হবে জয়
৩.
উত্তর দুয়ারি ঘরের রাজা

দক্ষিণ দুয়ারি তাহার প্রজা।
পূর্ব দুয়ারির খাজনা নাই
পশ্চিম দুয়ারির মুখে ছাই।।
৪.
কপালে নাই ঘি,

ঠকঠকালে হবে কি!
৫.
নিজের বেলায় আটিঁগাটি,

পরের বেলায় চিমটি কাটি।
৬.
পুকুরে তে পানি নাই, পাতা কেনো ভাসে

যার কথা মনে করি সেই কেনো হাসে ?
৭.
ভাত দেবার মুরোদ নাই,

কিল দেবার গোসাঁই।
৮.
নদীর জল ঘোলাও ভালো,

জাতের মেয়ে কালোও ভালো
৯.
খাঁদা নাকে আবার নথ !
১০.
থাক দুখ পিতে,(পিত্তে)

ঢালমু দুখ মাঘ মাসের শীতে।
১১.
কি কর শ্বশুর মিছে খেটে

ফাল্গুনে এঁটে পোত কেটে
বেড়ে যাবে ঝাড়কি ঝাড়
কলা বইতে ভাংগে ঘাড়।
১২.
ভাদরে করে কলা রোপন

স্ববংশে মরিল রাবণ।
১৩.
গো নারিকেল নেড়ে রো

আমা টুকরা কাঁঠাল ভো।
১৪.
সুপারীতে গোবর, বাশে মাটি

অফলা নারিকেল শিকর কাটি
১৫.
খনা বলে শুনে যাও

নারিকেল মুলে চিটা দাও
গাছ হয় তাজা মোটা
তাড়াতাড়ি ধরে গোটা।
১৬.
ডাক ছেড়ে বলে রাবণ

কলা রোবে আষাঢ় শ্রাবণ।
১৭.
পূর্ব আষাঢ়ে দক্ষিণা বয়

সেই বছর বন্যা হয়।
১৮.
মংগলে উষা বুধে পা

যথা ইচ্ছা তথা যা।
১৯.
পুত্র ভাগ্যে যশ
কন্যা ভাগ্যে লক্ষী
২০.
উঠান ভরা লাউ শশা
ঘরে তার লক্ষীর দশা
২১.
বামুন বাদল বান

দক্ষিণা পেলেই মান।
২২.
বেঙ ডাকে ঘহন ঘন

শীঘ্র হবে বৃষ্টি জান।
২৩.
আউশ ধানের চাষ

লাগে তিন মাস।
২৪.
যদি বর্ষে গাল্গুনে

চিনা কাউন দ্বিগুনে।
২৫.

যদি হয় চৈতে বৃষ্টি

তবে হবে ধানের সৃষ্টি।
২৬.
চালায় চালায় কুমুড় পাতা

লক্ষ্মী বলেন আছি তথা।
২৭.
আখ আদা রুই

এই তিন চৈতে রুই।
২৮.
দাতার নারিকেল, বখিলের বাঁশ
কমে না বাড়ে বারো মাস।
২৯.
সোমে ও বুধে না দিও হাত
ধার করিয়া খাইও ভাত।
৩০.
জৈষ্ঠতে তারা ফুটে
তবে জানবে বর্ষা বটে।
৩১.
বাঁশের ধারে হলুদ দিলে
খনা বলে দ্বিগুণ বাড়ে।
৩২.

গাই পালে মেয়ে
দুধ পড়ে বেয়ে।
৩৩.

শুনরে বাপু চাষার বেটা
মাটির মধ্যে বেলে যেটা
তাতে যদি বুনিস পটল
তাতে তোর আশার সফল।
৩৪.

মাঘ মাসে বর্ষে দেবা
রাজ্য ছেড়ে প্রজার সেবা।
৩৫.
চৈতের কুয়া আমের ক্ষয়
তাল তেঁতুলের কিবা হয়।
অর্থ-কুয়াশায় আমের বোল নষ্ট হয়ে যায়
৩৬.

আমে ধান
তেঁতুলে বান।
অর্থ- আম বেশি ফললে ধান বেশি জন্মে। তেঁতুল বেশি ফললে ঝড় বন্যা হয়।
৩৭.

হইবো পুতে ডাকবো বাপ
তয় পুরবো মনর থাপ।
৩৮.
পারেনা .ল ফালাইতে

উইঠা থাকে বিয়ান রাইতে।
৩৯.
যদি বর্ষে মাঘের শেষ
ধন্যি রাজা পুণ্যি দেশ
৪০.

চৈত্রে দিয়া মাটি
বৈশাখে কর পরিপাটি।
৪১.
সূর্যের চেয়ে বালি গরম!!
নদীর চেয়ে প্যাক ঠান্ডা!!
৪২.

সমানে সমানে দোস্তি
সমানে সমানে কুস্তি।
৪৩.
হোলা গোশশা অইলে বাশশা,

মাইয়া গোশশা অইলে বেইশশা
৪৪.

মেয়ে নষ্ট ঘাটে,
ছেলে নষ্ট হাটে।
৪৫.

আল্লায় দিয়া ধন দেখে মন,
কাইড়া নিতে কতক্ষণ।
৪৬.

যদি থাকে বন্ধুরে মন
গাং সাঁতরাইতে কতক্ষন।
৪৭.

কাল ধানের ধলা পিঠা,
মা'র চেয়ে মাসি মিঠা।
৪৮.
পরের বাড়ির পিঠা

খাইতে বড় ই মিঠা।
৪৯.

ঘরের কোনে মরিচ গাছ
লাল মরিচ ধরে,
তোমার কথা মনে হলে
চোখের পানি পড়ে!
৫০.
সোল বোয়ালের পোনা
যার যারটা তার তার কাছে সোনা।
৫১.

ছায়া ভালো ছাতার তল,
বল ভালো নিজের বল।
(বিয়াই'র পুত নিয়া সাত পুত গুণতে নাই।)
৫২.
যা করিবে বান্দা তা-ই পাইবে।

সুই চুরি করিলে কুড়াল হারাইবে।
৫৩.
খালি পেটে পানি খায়

যার যার বুঝে খায়।
৫৪.
তেলা মাথায় ঢালো তেল,

শুকনো মাথায় ভাঙ্গ বেল।
৫৫.
চৈত্রে চালিতা,

বৈশাখে নালিতা,
আষাড়ে.........
ভাদ্রে তালের পিঠা।
আর্শ্বিনে ওল,
কার্তিকে কৈয়ের ঝুল
৫৬.
মিললে মেলা।

না মিললে একলা একলা ভালা!
৫৭.

সাত পুরুষে কুমাড়ের ঝি,
সরা দেইখা কয়, এইটা কি?
৫৮.

না পাইয়া পাইছে ধন;
বাপে পুতে কীর্তন।
৫৯.

কাচায় না নোয়ালে বাশ,
পাকলে করে ঠাস ঠাস!
৬০.

যুগরে খাইছে ভূতে
বাপরে মারে পুতে।
৬১.

দশে মিলে করি কাজ
হারি জিতি নাহি লাজ।
৬২.
যাও পাখি বলো তারে

সে যেন ভুলেনা মোরে।
৬৩.

ফুল তুলিয়া রুমাল দিলাম যতন করি রাখিও।
আমার কথা মনে ফইল্লে রুমাল খুলি দেখিও।
৬৪.
একে তে নাচুনী বুড়ি,
তার উপর ঢোলের বারি
৬৫.
চোরের মার বড় গলা

লাফ দিয়ে খায় গাছের কলা
৬৬.
ভাই বড়ো ধন, রক্তের বাঁধন

যদি ও পৃথক হয়, নারীর কারন।
৬৭.
জ্যৈষ্ঠে শুকো আষাঢ়ে ধারা।

শস্যের ভার না সহে ধরা।
৬৮.
যদি হয় সুজন

এক পিড়িতে নয় জন।
যদি হয় কুজন
নয় পিড়িতে নয় জন
*(যদি হয় সুজন,
তেতুল পাতায় ন'জন।)
৬৯.
"হাতিরও পিছলে পাও।

সুজনেরও ডুবে নাও।"
৭০.
গাঙ দেখলে মুত আসে

নাঙ দেখলে হাস আসে (নাঙ মানে - স্বামী)
৭১.
ক্ষেত আর পুত।

যত্ন বিনে যমদূত।।
৭২.

গরু ছাগলের মুখে বিষ।
চারা না খায় রাখিস দিশ ।।

বন্যা, মড়ক, বৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি
৭৩.
আকাশে কোদালীর বাউ।

ওগো শ্বশুড় মাঠে যাও।।
মাঠে গিয়া বাঁধো আলি।
বৃষ্টি হবে আজি কালি।।
৭৪.

যদি ঝরে কাত্তি।
সোনা রাত্তি রাত্তি।।
৭৫.

আষাঢ়ের পানি।
তলে দিয়া গেলে সার।
উপরে দিয়া গেলে ক্ষার।।

হল (লাঙ্গল চালনা)

৭৬.

গাঁ গড়ানে ঘন পা।
যেমন মা তেমন ছা।।
থেকে বলদ না বয় হাল,
তার দু:খ সর্ব্বকাল।

গবাদি

৭৭.

যে চাষা খায় পেট ভরে।
গরুর পানে চায় না ফিরে।
গরু না পায় ঘাস পানি।
ফলন নাই তার হয়রানি।।
৭৮.

গরুর পিঠে তুললে হাত।
গিরস্থে কভু পায় না ভাত।।
গাই দিয়া বায় হাল
দু:খ তার চিরকাল।

ধান্যাদি

৭৯.

দিন থাকতে বাঁধে আল।
তবে খায় তিন শাল।।
বারো পুত তেরো নাতি।
তবে করো বোরো খেতি।।

রবি শস্যাদি

৮০.

মেঘ করে রাত্রে হয় জল।
তবে মাঠে যাওয়াই বিফল।।
৮১.

যদি থাকে টাকা করবার গোঁ।
চৈত্র মাসে ভুট্টা দিয়ে রো।।
৮২.

হলে ফুল কাট শনা।
পাট পাকিলে লাভ দ্বিগুণা।।
৮৩.
সকাল শোয় সকাল ওঠে

তার কড়ি না বৈদ্য লুটে
৮৪.
আলো হাওয়া বেঁধো না

রোগে ভোগে মরো না।
৮৫.
যে চাষা খায় পেট ভরে

গরুর পানে চায় না ফিরে
গরু না পায় ঘাস পানি
ফলন নাই তার হয়রানি
৮৬.
খনা ডেকে বলে যান
রোদে ধান ছায়ায় পান
৮৭.
গাছগাছালি ঘন সবে না
গাছ হবে তার ফল হবে না
৮৮.
হাত বিশ করি ফাঁক
আম কাঁঠাল পুঁতে রাখ
৮৯.
যদি না হয় আগনে বৃষ্টি
তবে না হয় কাঁঠালের সৃষ্টি
৯০.
যত জ্বালে ব্যঞ্জন মিষ্ট
তত জ্বালে ভাত নষ্ট
৯১.
যে না শোনে খনার বচন
সংসারে তার চির পচন৷
৯২.
শোনরে বাপু চাষার পো
সুপারী বাগে মান্দার রো৷
মান্দার পাতা পচলে গোড়ায়
ফড়ফড়াইয়া ফল বাড়ায়৷
৯৩.
চাষী আর চষা মাটি
এ দু'য়ে হয় দেশ খাঁটি।
৯৪.
গাছে গাছে আগুন জ্বলে
বৃষ্টি হবে খনায় বলে।
৯৫.
জ্যৈষ্ঠে খরা, আষাঢ়ে ভরা
শস্যের ভার সহে না ধরা।
৯৬.
আষাঢ় মাসে বান্ধে আইল
তবে খায় বহু শাইল।
৯৭.
আষাঢ়ে পনের শ্রাবণে পুরো
ধান লাগাও যত পারো।
৯৮.
তিন শাওনে পান
এক আশ্বিনে ধান।
৯৯.
পটল বুনলে ফাগুন
ফলন বাড়ে দ্বিগুণে।
১০০.
ফাগুনে আগুন, চৈতে মাট
বাঁশ বলে শীঘ্র উঠি।
১০১.
ভাদ্রের চারি, আশ্বিনের চারি
কলাই করি যত পারি।
১০২.
লাঙ্গলে না খুঁড়লে মাটি, মই না দিলে পরিপাটি
ফসল হয় না কান্নাকাটি।
১০৩.
সবলা গরু সুজন পুত
রাখতে পারে খেতের জুত।
১০৪.
গরু-জরু-ক্ষেত-পুতা
চাষীর বেটার মূল সুতা।
১০৫.
সবল গরু, গভীর চাষ
তাতে পুরে চাষার আশ।
১০৬.
শোন শোন চাষি ভাই
সার না দিলে ফসল নাই।
১০৭.
হালে নড়বড়, দুধে পানি
লক্ষ্মী বলে চাড়লাম আমি।
১০৮.
রোদে ধান, ছায়ায় পান।
১০৯.
আগে বাঁধবে আইল
তবে রুবে শাইল।
১১০.
গাছ-গাছালি ঘন রোবে না
গাছ হবে তাতে ফল হবে না।
১১১.
খরা ভুয়ে ঢালবি জল
সারাবছর পাবি ফল।
১১২.
ডাঙ্গা নিড়ান বান্ধন আলি
তাতে দিও নানা শালি।
১১৩.
কাঁচা রোপা শুকায়
ভুঁইয়ে ধান ভুঁইয়ে লুটায়।
১১৪.
বার পুত, তের নাতি
তবে কর কুশার ক্ষেতি।
১১৫.
তাল বাড়ে ঝোপে
খেজুর বাড়ে কোপে।
১১৬.
গাজর, গন্ধি, সুরী
তিন বোধে দূরী।
১১৭.
খনা বলে শোনভাই
তুলায় তুলা অধিক পাই।
১১৮.
ঘন সরিষা পাতলা রাই
নেংগে নেংগে কার্পাস পাই।
১১৯.
বারো মাসে বারো ফল
না খেলে যায় রসাতল।
১২০.
ফল খেয়ে জল খায়
জম বলে আয় আয়।
১২১.
কলা-রুয়ে কেটো না পাত,
তাতে কাপড় তাতেই ভাত।

♣♣♣♣♣ ☼☼☼☼☼☼☼ ☺☺☺☺☺☺ ♠♠♠♠♠♠♠♠
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার ও গুরুত্ব অপরিসীম। অধিকাংশের-ই জনক খনা। এখানে আমার সংগ্রহীত কিছু খনার বচন রেখে দিলাম। আপনাদের যদি এর বাইরে আরও জানা থাকে তাহলে Comment box এ Pasteকরুন। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে হয়ে উঠতে পারে খনার বচনের অসাধারণ আর্কাইভ।

Sunday, October 18, 2009

Khona Drama 86-105

86th Episod

******************************************************
87th Episod

******************************************************
88th Episod

******************************************************
89th th Episod

******************************************************
90th Episod

******************************************************
91st Episod

******************************************************
92nd Episod

******************************************************
93rd Episod

******************************************************
94th Episod

******************************************************
95th Episod

******************************************************
96th Episod

******************************************************
97th Episod

******************************************************
98th Episod

******************************************************
99th Episod

******************************************************
100th Episod

******************************************************
101st Episod

******************************************************
102nd Episod

******************************************************
103rd Episod

******************************************************
104th Episod

******************************************************
105th Episod

******************************************************

Khona Drama 61-85

61st Episod

******************************************************
62nd Episod

******************************************************
63rd Episod

******************************************************
64th Episod

******************************************************
65th Episod

******************************************************
66th Episod

******************************************************
67th Episod

******************************************************
68th Episod

******************************************************
69th Episod

******************************************************
70th Episod

******************************************************
71st Episod

******************************************************
72nd Episod

******************************************************
73rd Episod

******************************************************
74th Episod

******************************************************
75th Episod

******************************************************
76th Episod

******************************************************
77th Episod

******************************************************
78th Episod

******************************************************
79th Episod

******************************************************
80th Episod

******************************************************
81st Episod

******************************************************
82nd Episod

******************************************************
83th Episod

******************************************************
84th Episod

******************************************************
85th Episod

******************************************************

Khona Drama 51-60

51th Episod

******************************************************
52nd Episod

******************************************************
53rd Episod

******************************************************
54th Episod

******************************************************
55th Episod

******************************************************
56th Episod

******************************************************
57th Episod

******************************************************
58th Episod

******************************************************
59th Episod

******************************************************
60th Episod

******************************************************

Khona Drama 41-50

41st Episod

*************************************************************
42nd Episod

*************************************************************
43rd Episod

*************************************************************
44th Episod

*************************************************************
45th Episod

*************************************************************
46th Episod

*************************************************************
47th Episod

*************************************************************
48th Episod

*************************************************************
49th Episod

*************************************************************
50th Episod

*************************************************************